বাংলাদেশ : ১৯৬৯
বাংলাদেশের আরো অগণিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ভুক্তের মতো প্রারম্ভিক অন্ধ গান্ধিভক্তি থেকে শেষবয়সে আমার বাবার অয়ন ঘটে কমিউনিস্ট পার্টির সন্নিকট বৃত্তে। ১৯৬৪ সালের যে সপ্তাহে কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে দু’ভাগ হয়, সেই সপ্তাহেই আমার বাবা মারা যান। ঘনবদ্ধ তমিশ্রার সময় গেছে সেটা, আন্দোলন ছত্রভঙ্গ, পরিপার্শ্ব নির্জীব ভদ্রলোক মৃত্যুর অব্যবহিত আগে মনে পড়ে দুঃখ ক’রে বলেছিলেন: যা ব্যাপার-স্যাপার ঘটে গেলো, গোটা পঁচিশ বছরের মধ্যেও আর দেশে কমিউনিজম আসবে না।
কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরেই ভেল্কিবাজি হয়েছে। আসলে ইতিহাস নিজের নিয়ম বেয়ে এগোবেই। সাময়িক বাধা মাঝে মাঝে কিছু অস্থৈর্যের সঞ্চার করতে পারে মাত্র, তার বেশি কিছু না। এই পাঁচ বছরে বাংলাদেশের পটভূমি যেমন বদলেছে, মানসিকতার রঙও আশ্চর্য দ্রুততায় পরিবর্তিত হয়েছে সেই সঙ্গে। দ্রুত, ক্ষিপ্র, তীক্ষ্ণ, কোলাহলদীর্ণ এক আবর্তের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি। ইতিহাস খানিকটা সময় থমকে থেকে হঠাৎ ফের বেগবান হয়েছে বলেই হয়তো, এক সঙ্গে অনেককিছু ঘটছে, তাল-বেতাল, প্রকট-অস্ফুট, মোলায়েম-রূঢ়, মহান-ক্লেদাক্ত। একটি বিশেষ গ্রহের আবহের আনুগত্য থেকে অন্য এক মূল্যের আবহে পৌঁছুবার ক্রান্তিলগ্নে এরকম এলোপাথাড়ি ঘটনা-উপঘটনা অনিবার্য। সামাজিক উপপ্লবের প্রথাটি কোনোদেশেই ঠিক মধ্যবিত্ত আচার কলা-শিষ্টতা-ভদ্রতা মেনে নিয়ে এগোয় না। গণিতের অনুশাসনে সমাজ কখনোই বাঁধা পড়ে না। যদি পড়তো, তাহলে একমাত্র পদার্থবিজ্ঞানী ছাড়া কারো প্রয়োজনই থাকতো না এই পৃথিবীতে।
রোজ কাগজ খুলে আপাতত আমাদের বিঘ্নিত শান্তির খবর পড়তে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে দামাল অশান্তি, কলকারখানায় ঘেরাও-ধর্মঘট, ছাত্রমহলে উচ্চগ্রাম অবিনয়ী প্রতিবাদ, সদাগরী পাড়ায় কেরানিদের শক্তির আস্ফালন। ভীষণরকম গোলমাল, করালবদনী তারা শ্মশানে নৃত্যরতা হলে যে ধরনের প্রলয়াভাস আমাদের কল্পনায় আসে, হবহু যেন সেরকম অবস্থা। অবিকল নৈরাজ্য নয়; অসুবিধা ঘটলেও, অধিকাংশ শ্রেণীর লোকই এখন পর্যন্ত মোটামুটি খাচ্ছে-দাচ্ছে, কিন্তু একটা অর্ধস্বচ্ছ অনুভাবনা যে আর খুব বেশিদিন এভাবে চলতে পারবে না, বিস্ফোরণ ঘটবেই। এই বিস্ফোরণের আশঙ্কায় কেউ ভয়ে কুঁকড়ে আসছেন. কেউ শিলীভূত ক্রোধে রুদ্ধবাক হচ্ছেন; অন্য কেউ-কেউ বিস্ফোরণের প্রত্যন্তে নীলাকাশ-কাশফুল ইত্যাদির স্বপ্ন দেখছেন; তেমন-কেউই নিরপেক্ষ চিন্তায় উৎক্ষিপ্ত নেই আর।
তার আগে শ্রেণী বিভাজনের দিকে ক্রমশ আমরা এগোচ্ছি। ঢালাও উক্তি করা হল। মানছি, যা যা ঘটছে তাদের মধ্যে অনেক উচ্চাবচতা আছে, অমুক তত্ত্বের তমুক প্রশাখার ফলিত দৃষ্টান্ত কেউ খুঁজতে গেলে অযথা হন্যে হবেন, নয়তো গোঁজামিল দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আপাতপরস্পর বিরোধী অনেক কিছুর সমন্বয় ১৯৬৯ সালের বাংলাদেশে যে মীমাংসাই উপস্থিত করি না কেন, তার পরিপন্থী কোনো ভগ্নাংশিক সিদ্ধান্ত অন্য কেউ নিশ্চয়ই প্রায় সঙ্গে সঙ্গে হাজির করতে পারবেন। সুতরাং আমি পাদটীকা নিয়ে ঝগড়ায় নামবো না, খুব সাধারণভাবে শাদামাটা কতগুলি লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করব। লক্ষণগুলি দেখেই মনে হয়, ছায়া পূর্বগামিনী।
দেখে-শুনে প্রথমেই যা মনে হয়, বাঙালি সমাজে মিহিন মধ্যবিত্তদের প্রভাব কমছে, একদা-যাঁরা-ভদ্রলোক-নাম- অভিহিত হতেন, তাঁদের একটা বড়ো অংশ শ্রেণীস্খলিত হয়ে প্রথাগত ছোটোলোকদের কাছাকাছি যাচ্ছেন। দেশভাগ না হলে এই পরিবর্তন অসম্ভব ছিল। দুটে ঘটনাক্রমের ফলে ভদ্রশ্রেণী কৌলিন্যহৃত হয়েছেন, এখনো হচ্ছেন। কলোনিতে-ষ্টেশনের প্ল্যাটফর্মে-শহরের বস্তিতে জড়ো হওয়া শরণার্থী সম্প্রদায় বিগত দুই দশকে মস্ত ক্রান্তির মধ্য দিয়ে গেছেন। বামুন-বদ্যি-কায়েতরা পূর্ববঙ্গের ভিটেবাড়ির নিটোল সুধাচ্ছন্দ্যের স্বপ্নগর্ব অহমিকা আস্তে আস্তে তুলেছেন, গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ ইত্যাদির স্বতি ফিকে হতে হতে একেবারেই মিলিয়ে গেছে। বর্তমানের প্রকট দারিদ্র-খিন্নতার মধ্যে যে-ছেলেমেয়েরা আস্বাস্থ্যে-বিরক্তিতে বড়ো হয়ে উঠেছে, পূর্ববঙ্গের অভিজাত রূপকাহিনী তাদের কাছে উপহাসকথার পরিচয় নিয়ে প্রতিভাত হয়েছে। যেখানে স্মৃতি নেই, সেখানে জড়তাও নেই। কলোনির শিশু-সম্প্রদায় তাই সমতায় মিলতে পেরেছে, বিত্তহীনদের অভাবের সমতায় পরপরের কাছাকাছি চলে এসেছে। খাদ্যে-পোশাকে-শিক্ষার সুযোগে অবস্থানের মালিন্যে একেবারে কাছাকাছি এসে যাওয়া একদা যারা জমিদার ছিলেন, শৌখিন সদাগর ছিলেন, রাজপুরুষ পরিবারের অঙ্গীভূত ছিলেন, টিটাগড়ে যাদবপুরে ভেলেনি-পাড়ায়-শক্তিগড়ে-রানাঘাটে-কল্যাণীতে তারা
লেখাটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
এক বছর
এক মাস
রেজিস্ট্রেশন করা নেই? রেজিস্ট্রেশন করে ৭ দিন বিনামূল্যে ব্যবহার করুন
যোগাযোগ করতে
Leave A Comment
Don’t worry ! Your email address will not be published. Required fields are marked (*).

Comments